মানব সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রায় শিল্প, সংস্কৃতি এবং নান্দনিক চেতনার বিকাশ মানুষের আত্মিক উন্নতির অন্যতম প্রধান সোপান। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু দুর্লভ গ্রন্থ রয়েছে, যা কেবল একটি যুগের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না, বরং হাজার বছর ধরে পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে পথপ্রদর্শন করে। ভারতীয় নাট্য, নৃত্য, সংগীত এবং সামগ্রিক পারফর্মিং আর্টসের ইতিহাসে তেমনই একটি আদি ও প্রামাণ্য তাত্ত্বিক দলিল হলো মহর্ষি ভরত মুনি সংকলিত ‘নাট্যশাস্ত্র’। এই গ্রন্থটি কেবল একটি নাটক রচনার নির্দেশনা নয়; বরং এটি মানব জীবনের আবেগ, নান্দনিক দর্শন, মনস্তত্ত্ব এবং পরিবেশনশিল্পের এক পূর্ণাঙ্গ ও সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক দলিল। প্রাচীন ভারতের শিল্পতত্ত্বকে যেভাবে এটি কাঠামোগত রূপ দিয়েছে, বিশ্ব সংস্কৃতির ইতিহাসে তার সমকক্ষ গ্রন্থ মেলা ভার।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, কালনির্ণয় ও রচনাকাল
ভরতের নাট্যশাস্ত্রের সঠিক রচনাকাল বা কালনির্ণয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষক ও পণ্ডিতদের মধ্যে নানা মতপার্থক্য ও বিতর্ক চলে আসছে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে আধুনিক গবেষকগণ মনে করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ২০০ শতকের মধ্যবর্তী একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে এই গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশ সংকলিত ও সম্পাদিত হয়েছে। একক কোনো ব্যক্তির এককালীন রচনা হিসেবে এটি তৈরি হয়নি, বরং একটি দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এটি একটি সংকলিত রূপ লাভ করেছে।
-
প্রামাণ্য সংস্করণ ও বিন্যাস: নাট্যশাস্ত্রের ঐতিহ্যগত এবং বহুল প্রচলিত সংস্করণটি ৩৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত (কিছু প্রাচীন পান্ডুলিপিতে ৩৭টি অধ্যায়ের উল্লেখও পাওয়া যায়)। পুরো গ্রন্থে প্রায় ৬,০০০ শ্লোক বা অনুষ্টুপ ছন্দ রয়েছে।
-
সংকলক পরিচিতি: ভারতীয় ঐতিহ্যে ঋষি ভরত মুনিকে এই শাস্ত্রের আদি প্রণেতা বলে মনে করা হয়। তবে ‘ভরত’ শব্দটি কোনো একক ব্যক্তির নাম নাকি একাধিক আচার্যের একটি সমষ্টিগত উপাধি—তা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে নানা মতামত রয়েছে। তা সত্ত্বেও, নাট্যশাস্ত্রের পুরো পঠনকাঠামো জুড়ে যে সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়, তা যেকোনো একক বা সুসংগঠিত পণ্ডিত গোষ্ঠীর সুদীর্ঘ সাধনার ফল বলেই প্রতীয়মান হয়।
নাট্যশাস্ত্র সৃষ্টির পৌরাণিক উপাখ্যান ও নাট্যবেদের উৎপত্তি
পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, সত্যযুগের অবসান এবং ত্রেতাযুগের শুরুতে যখন সমাজে লোভ, মোহ, হিংসা এবং ভেদাভেদ বৃদ্ধি পেল, তখন দেবরাজ ইন্দ্রের নেতৃত্বে দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। তাঁরা এমন একটি বিনোদনের মাধ্যম প্রার্থনা করেন, যা একই সাথে দৃশ্য ও শ্রাব্য এবং শূদ্রসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষ যার দ্বারা শিক্ষা ও আনন্দ লাভ করতে পারে।
দেবতাদের এই আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্রহ্মা ঋগ্বেদ থেকে বাক্য, সামবেদ থেকে গান, যজুর্বেদ থেকে অভিনয় এবং অথর্ববেদ থেকে রস গ্রহণ করে পঞ্চম বেদ বা ‘নাট্যবেদ’ সৃষ্টি করেন। ব্রহ্মা এই নাট্যবেদের প্রয়োগভার অর্পণ করেন মহর্ষি ভরত মুনির ওপর, যাঁর একশো জন পুত্র ও শিষ্য ছিল। ভরত মুনি প্রথম মর্ত্যের মানুষের সামনে নাটকের মাধ্যমে এই বেদ উপস্থাপন করেন। এই পৌরাণিক আখ্যানের অন্তরালে মূলত এই সত্যটিই লুকিয়ে রয়েছে যে, নাটক হলো মানব সমাজের সমস্ত উপলব্ধ বেদ ও জ্ঞানকে একত্রিত করে একটি উপভোগ্য ও শিক্ষণীয় রূপ দেওয়ার মাধ্যম।
নাট্যশাস্ত্রে রস ও ভাবতত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ
ভরতের নাট্যশাস্ত্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও মৌলিক তত্ত্ব হলো এর ‘রসতত্ত্ব’ (Theory of Rasa)। ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত এই তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, সাহিত্য বা নাটকের মূল উদ্দেশ্য হলো দর্শকের মনে এক বিশেষ নান্দনিক আনন্দ বা অনুভূতির জন্ম দেওয়া।
রস ও ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক
ভরত মুনির বিখ্যাত সূত্রানুসারে— “সংয়োগাদ রসনিষ্পত্তিঃ” অর্থাৎ বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী বা সঞ্চারী ভাবের পারস্পরিক সংযোগেই ‘রস’ এর উৎপত্তি হয়।
-
স্থায়ী ভাব: মানুষের মনে সহজাতভাবে যে আবেগগুলো সবসময় সুপ্ত অবস্থায় থাকে (যেমন—রতি, শোক, রাগ, উৎসাহ ইত্যাদি), তা হলো স্থায়ী ভাব।
-
বিভাব: যে কারণে বা উপকরণের মাধ্যমে স্থায়ী ভাব মনে জাগরিত হয় (যেমন—নায়ক-নায়িকা, মনোরম পরিবেশ ইত্যাদি)।
-
অনুভাব: স্থায়ী ভাব জাগার পর মানুষের শরীরের বাহ্যিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া (যেমন—হাসি, চোখের জল, কাঁপা ইত্যাদি)।
-
সঞ্চারী বা ব্যভিচারী ভাব: স্থায়ী ভাবকে পুষ্ট করার জন্য মনে ক্ষণস্থায়ীভাবে যেসব আবেগ আসা-যাওয়া করে (যেমন—লজ্জা, ভয়, গ্লানি, আনন্দ)।
নবরসের উদ্ভব ও স্বরূপ
মূলত আটটি রসের কথা ভরত মুনি প্রথমে উল্লেখ করেছিলেন, পরবর্তীকালে এর সাথে ‘শান্ত রস’ যুক্ত হয়ে তা ‘নবরস’ নামে পরিচিত হয়:
-
শৃঙ্গার রস: প্রেম, সৌন্দর্য ও আকর্ষণ।
-
হাস্য রস: উপহাস, হাস্যরস ও আনন্দ।
-
করুণ রস: শোক, বেদনা ও বিয়োগান্তক অনুভূতি।
-
রৌদ্র রস: ক্রোধ, রাগ ও ধ্বংসাত্মক শক্তি।
-
বীর রস: উৎসাহ, পরাক্রম ও বীরত্ব।
-
ভয়ানক রস: ভয়, আতঙ্ক ও শঙ্কা।
-
বীভৎস রস: ঘৃণা, জুগুপ্সা ও অপছন্দ।
-
অদ্ভুত রস: বিস্ময়, অবাক করা পরিস্থিতি।
-
শান্ত রস: প্রশান্তি, মুক্তি ও আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টি।
অভিনয়শিল্পের চতুর্বিধ রূপ বা অভিনয়ের প্রকারভেদ
নাট্যশাস্ত্র মানুষকে জীবন্ত করে তোলার জন্য অভিনয়ের ক্ষেত্রে চার ধরনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা বলেছে, যা ‘চতুর্বিধ অভিনয়’ নামে পরিচিত:
-
আঙ্গিক অভিনয়: শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন—হাত, পা, চোখ, মাথা এবং পেশির সঞ্চালনের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা। এতে অঙ্গ, উপাঙ্গ এবং প্রত্যঙ্গের নিখুঁত ব্যায়াম ও মুদ্রা জড়িত।
-
বাচবিক অভিনয়: কথার উচ্চারণ, স্বরগ্রাম, স্বরের উচ্চতা, পঠনশীতি এবং ভাষার ব্যাকরণগত প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থ ফুটিয়ে তোলা।
-
আহার্য অভিনয়: পোশাক-পরিচ্ছদ, সাজসজ্জা, মেকআপ এবং মঞ্চের প্রপস বা উপকরণের মাধ্যমে চরিত্রের বাহ্যিক রূপায়ন।
-
সাত্ত্বিক অভিনয়: মনের গভীরের আবেগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ—যেমন চোখে জল আসা, গায়ে কাঁটা দেওয়া (রোমাঞ্চ), কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠা বা অবচেতনভাবে ঘাম হওয়া, যা কৃত্রিমভাবে করা যায় না।
সংগীত, তাল এবং স্বরগ্রামের আদি উৎস
অনেکے মনে করেন নাট্যশাস্ত্র কেবল নাটক ও অভিনয়ের বই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাস ও তত্ত্বের সবচেয়ে বড় উৎস এই গ্রন্থটি। নাট্যশাস্ত্রে সংগীতকে ‘গান্ধর্বসংগীত’ বলা হয়েছে। ২৮ থেকে ৩৬ তম অধ্যায় পর্যন্ত সংগীত, স্বর, মূর্ছনা এবং তালের ওপর বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।
-
স্বর ও সপ্তক: প্রাচীন ভারতীয় সংগীতে ষড়জ (সা), ঋষভ (রে), গান্ধার (গা), মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা), ধৈবত (ধা), নিষাদ (নি)—এই সাতটি স্বরের উৎস এবং তাদের পারস্পরিক গাণিতিক সম্পর্ক নাট্যশাস্ত্রে প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
-
জাতি ও রাগ: আধুনিক রাগের পূর্বসূরি হিসেবে ‘জাতি’ (Jati) ধারণার বিকাশ ঘটেছিল এই শাস্ত্রেই। কোন ঋতুতে, কোন সময়ে এবং কোন রসে কোন স্বর বা রাগ গাওয়া উচিত, তার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা এতে রয়েছে।
-
তাল ও ছন্দ: গান ও নৃত্যের ছন্দ ঠিক রাখার জন্য তালের ধারণা অপরিহার্য। নাট্যশাস্ত্রের বিভিন্ন ছন্দের বিন্যাস ভারতীয় লয় ও তালের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে।
বাদ্যযন্ত্রের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস (অর্গানোলজি)
বিশ্ব সংগীতের ইতিহাসে বাদ্যযন্ত্রের প্রথম এবং সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস পাওয়া যায় ভরতের নাট্যশাস্ত্রে। ভরত মুনি সমস্ত বাদ্যযন্ত্রকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন, যা আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বিজ্ঞানেরও মূল ভিত্তি:
| বাদ্যযন্ত্রের শ্রেণি | বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা | প্রধান উদাহরণ |
| তাত বাদ্য (Chordophones) | যে যন্ত্রগুলোতে তার টানটান করে আঙুল বা কোণাকৃতির যন্ত্র দিয়ে বাজানো হয় এবং তারের কম্পনে শব্দ উৎপন্ন হয়। | বীণা, সেতার, তানপুরা, একতারা |
| সুষির বাদ্য (Aerophones) | যে যন্ত্রগুলোর ভেতরে ফুঁ দিয়ে বায়ু চালনা করার মাধ্যমে এবং নলের ভেতরের বায়ুর কলাম কাঁপিয়ে শব্দ তৈরি করা হয়। | বাঁশি, সানাই, হারমোনিয়াম, ট্রাম্পেট |
| অবনদ্ধ বাদ্য (Membranophones) | কাঠ বা মাটির তৈরি খোলসের মুখে পশুর চামড়া শক্ত করে বেঁধে টেনে রাখা হয় এবং তাতে আঘাত করে শব্দ তোলা হয়। | মৃদঙ্গ, তবলার পূর্বসূরি পুষ্কর, ঢোল, ঢাক |
| ঘন বাদ্য (Idiophones) | যে যন্ত্রগুলো নিজে থেকেই কঠিন এবং আঘাত করলে বা ঘর্ষণ করলে সম্পূর্ণ দেহ কেঁপে ওঠে এবং শব্দ উৎপন্ন হয়। | মন্দিরা, করতাল, কাংস্য বা বাদ্যঘণ্টা |
প্রাচীন ভারতীয় বীণার বিবর্তন ও প্রকারভেদ
তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের পরিবারে ‘বীণা’ হলো প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও প্রধান বাদ্যযন্ত্র। নাট্যশাস্ত্র এবং পরবর্তী সংগীতগ্রন্থে বিভিন্ন ধরনের বীণার বিবরণ পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে তারযুক্ত প্রায় সব বাদ্যযন্ত্রকেই কোনো না কোনোভাবে বীণার রূপ হিসেবে দেখা হতো।
-
চিত্রা বীণা: এটি সাতটি তার বা তন্ত্রী বিশিষ্ট একটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম বাদ্যযন্ত্র ছিল, যা আঙুলের সাহায্য বাজানো হতো এবং এর সুর ছিল অত্যন্ত কোমল।
-
বিপক্ষী বীণা: এই যন্ত্রটিতে নয়টি তার বা তন্ত্রী ব্যবহার করা হতো এবং এটি বাজানোর জন্য বিশেষ পলেক্ট্রাম বা কোণাকৃতির কাঠের টুকরো বা জ্যা ব্যবহৃত হতো।
-
আলাপিনী ও কিন্নরী বীণা: পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে (খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে সপ্তম শতকের মধ্যে) আলাপিনী এবং কিন্নরী বীণার ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ফাঁপা বাঁশ এবং শুকনো লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি এই যন্ত্রগুলো সুরের অনুরণন (Resonance) বহুগুণ বাড়িয়ে দিত, যা পরবর্তীকালে সেতার বা সরোদের মতো আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের বিকাশের পথ সুগম করে।
নাট্যমঞ্চের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী (নাট্যমণ্ডপ)
নাট্যশাস্ত্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নাট্যমঞ্চ বা ‘নাট্যমণ্ডপ’ (Theater Architecture) নির্মাণের নিয়মাবলী বর্ণিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতে মঞ্চের আকৃতি এবং আয়তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো, যাতে শব্দের প্রতিধ্বনি এবং দর্শকের দেখার সুবিধা নিখুঁত হয়।
-
তিনটি আকার: নাট্যমণ্ডপ প্রধানত তিন আকারের হতো—আয়তক্ষেত্রাকার (বিকৃষ্ট), বর্গক্ষেত্রাকার (চতুরস্র) এবং ত্রিভুজাকার (ত্র্যস্র)। আবার ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এগুলোকে ছোট, মাঝারি ও বড়—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হতো।
-
আকৌস্টিকস বা শব্দবিজ্ঞান: প্রাচীন স্থপতিরা এমনভাবে মঞ্চ ও স্তম্ভগুলো নির্মাণ করতেন যাতে মাইক্রোফোন বা আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম না থাকা সত্ত্বেও মঞ্চের অভিনেতার ফিসফিসানি শব্দও পেছনের সারির দর্শকের কানে পরিষ্কার পৌঁছাতে পারে। এটি প্রাচীন ভারতীয় স্থপতিকলা এবং শব্দবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের প্রমাণ।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যকলায় নাট্যশাস্ত্রের প্রভাব
আধুনিক ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রধান শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী—যেমন ভরতনাট্যম, ওডিশি, কত্থক, কুচিপুড়ি, কথাকলি এবং মণিপুরী—প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত ব্যাকরণ ও নির্দেশনার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
-
করণ ও অঙ্গহার: নাট্যশাস্ত্রে ১০৮টি ‘করণ’ (নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বিত দেহভঙ্গি) এবং ৩২টি ‘অঙ্গহার’ (করণের সমষ্টি)-এর বিশদ বর্ণনা রয়েছে। ভারতের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলোর গায়ে ভাস্কর্যে খোদাই করা নৃত্যভঙ্গিগুলো মূলত নাট্যশাস্ত্রের এই করণগুলোরই পাথুরে রূপায়ণ।
-
মুদ্রা ও হস্তচালনা: শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার, যেমন—অসংযুক্ত হস্তমুদ্রা (এক হাতে প্রদর্শিত মুদ্রা) এবং সংযুক্ত হস্তমুদ্রা (দুটি হাতের মিলিত মুদ্রা), যা বর্তমানের সমস্ত ধ্রুপদী নৃত্যের ভাষা তৈরি করেছে, তার আদি উৎস এই নাট্যশাস্ত্র।
বিশ্ব নাট্যতত্ত্বে নাট্যশাস্ত্রের স্থান ও তুলনামূলক মূল্যায়ন
বিশ্বের প্রাচীন নাট্যসাহিত্যের দিকে তাকালে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’ (Poetics)-এর সাথে ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’-এর প্রায়ই তুলনা করা হয়। অ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্স মূলত ট্রাজেডি ও কমেডির সাহিত্যিক রূপ এবং প্লটের গঠনের ওপর বেশি জোর দিয়েছিল। পক্ষান্তরে, ভরতের নাট্যশাস্ত্র কেবল সাহিত্যিক রূপ নয়, বরং মঞ্চায়ন, অভিনয়, সঙ্গীত, নৃত্য, স্থপতিকলা এবং দর্শকের মানসিক অনুভূতির একটি সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক রূপরেখা। এই কারণে নাট্যশাস্ত্রকে বিশ্ব নাট্যতত্ত্বের ইতিহাসে অনেক বেশি বিস্তৃত এবং ব্যাপক বলে মনে করা হয়।
সাধারণ ভুল ধারণার সংশোধন ও তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি দূরীকরণ
অনেকের মধ্যে এই ভুল ধারণা রয়েছে যে নাট্যশাস্ত্র কেবল রাজদরবারের বিনোদনের জন্য বা উচ্চবিত্তের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। কিন্তু নাট্যশাস্ত্রের প্রথম অধ্যায়েই ভরত মুনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, এই শিল্প সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ধনী-দরিদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ নির্বিশেষে সকল মানুষের মন থেকে দুঃখ দূর করে নৈতিক শিক্ষা এবং আনন্দ প্রদান করাই এর মূল লক্ষ্য। এছাড়া, একে কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বই ভাবারও কোনো কারণ নেই; এটি মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ নান্দনিক ও শিল্পতাত্ত্বিক গ্রন্থ।

মহর্ষি ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ হলো ভারতীয় মনীষা ও সংস্কৃতির মুকুটে এক অমূল্য রত্ন। হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও আধুনিক কালের নাট্যকার, নৃত্যশিল্পী, সংগীতজ্ঞ এবং গবেষকদের জন্য এই গ্রন্থটি এক অনিবার্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে চলেছে। মানব মনের আবেগ, সুরের মুর্ছনা, ছন্দের গাণিতিক হিসাব এবং শিল্পের নান্দনিক রূপকে যেভাবে এই গ্রন্থে একত্রিত করা হয়েছে, তা অতুলনীয়। বিশ্ব সংস্কৃতির পটভূমিতে ভারতীয় শিল্পের স্বকীয়তা, গভীরতা এবং দার্শনিক সুদৃঢ়তা অনুধাবন করতে হলে ভরতের নাট্যশাস্ত্রের অধ্যয়ন এবং চর্চা চিরকাল প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য হয়ে থাকবে।
