ভরতের নাট্যশাস্ত্র পরিচিতি

ভারতীয় নাট্য, সংগীত নৃত্যকলার ইতিহাসে যে গ্রন্থটি সর্বাধিক প্রাচীন, বিস্তৃত এবং প্রামাণ্য বলে স্বীকৃত, তা হলো ভরতের নাট্যশাস্ত্র মহর্ষি ভরত মুনির রচিত এই গ্রন্থ শুধু নাট্যকলার নয়, সংগীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, মঞ্চসজ্জা, অভিনয়শৈলী এবং রসতত্ত্বসমগ্র পারফর্মিং আর্টসএর একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত নাট্যকলার প্রায় সব ধারাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই গ্রন্থের প্রভাব বহন করে।

ভরতের নাট্যশাস্ত্র পরিচিতি

 

ভরতের নাট্যশান্ত

 

ভরত মুনি ও নাট্যশাস্ত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

নাট্যশাস্ত্রের রচনাকাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় ২০০ সালের মধ্যে এর সংকলন সম্পন্ন হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই গ্রন্থে প্রায় ৬০০০ শ্লোক রয়েছে এবং এটি ৩৬ (মতান্তরে ৩৭) অধ্যায়ে বিভক্ত। এর মধ্যে সংগীত-সংক্রান্ত আলোচনা প্রধানত ২৮-৩০ অধ্যায়ে বিস্তৃত।

ভরত মুনি নাট্যকলাকে মানুষের শিক্ষা, নৈতিক উন্নতি এবং বিনোদনের একটি সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে নাট্যশিল্প মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি—যেখানে সংগীত, নৃত্য ও অভিনয় একত্রে মিলিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ শিল্পরূপ সৃষ্টি করে।

 

 

 

নাট্যশাস্ত্রে সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের আলোচনা

নাট্যশাস্ত্রে সংগীতকে গান্ধর্ব সংগীত নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং গীত, বাদ্য ও নৃত্যের সম্মিলিত রূপকে নাট্যকলার অপরিহার্য উপাদান বলা হয়েছে। গ্রন্থে নিবন্ধ (নির্দিষ্ট তাল-ছন্দযুক্ত) এবং অনিবদ্ধ (স্বাধীন) গানের উল্লেখ রয়েছে এবং উভয় ক্ষেত্রেই বাদ্যযন্ত্রের সহায়তার কথা বলা হয়েছে।

ভরত মুনি প্রধানত চার ধরনের বাদ্যযন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন—

  • তাত (তারযন্ত্র)
  • সুষির (বায়ুযন্ত্র)
  • অবনদ্ধ (চামড়াযন্ত্র)
  • ঘন (ধাতব আঘাতজাত যন্ত্র)

এই শ্রেণিবিভাগ পরবর্তীকালে ভারতীয় সংগীততত্ত্বে একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

 

নাট্যশাস্ত্রে বীণার গুরুত্ব

ভরত মুনি নাট্যশাস্ত্রে বিশেষভাবে বীণা যন্ত্রের আলোচনা করেছেন। তিনি ‘চিত্রা’ ও ‘বিপক্ষী’—এই দুই ধরনের বীণার উল্লেখ করেন।

  • চিত্রাবীণা – সাত তন্ত্রীবিশিষ্ট, আঙুলের সাহায্যে বাজানো হতো।
  • বিপক্ষী বীণা – নয় তন্ত্রীযুক্ত এবং পlectrum বা কোণাকৃতির যন্ত্রের সাহায্যে বাজানো হতো।

প্রাচীন ভারতে তারযুক্ত প্রায় সব বাদ্যযন্ত্রকেই কোনো না কোনোভাবে বীণা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ধরা হতো। ইতিহাসে প্রায় ৫৮ ধরনের বীণার উল্লেখ পাওয়া যায়, যদিও অধিকাংশই বর্তমানে বিলুপ্ত অথবা রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে আলোচিত কয়েকটি বীণা হলো—

  • সরস্বতী বীণা
  • রুদ্র বীণা
  • বিচিত্র বীণা

পরবর্তীকালে এই বীণা পরিবার থেকেই বহু আধুনিক তারযন্ত্রের বিকাশ ঘটে।

 

আলাপিনী ও কিন্নরী বীণার বিবরণ

খ্রিস্টীয় ৪০০-৭০০ সালের মধ্যে আলাপিনী বীণাকিন্নরী বীণা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আলাপিনী বীণা

  • একটি শুকনো লাউ ও ফাঁপা বাঁশের দণ্ড দিয়ে তৈরি হতো।
  • প্রথমে একটি তার থাকলেও পরে দ্বিতীয় তার যুক্ত হয়।
  • অল্প সংখ্যক পর্দা থাকায় এটি সহজ কাঠামোর হলেও সুরে ছিল গভীরতা।

কিন্নরী বীণা

  • সাতটি পর্দাযুক্ত ছিল।
  • তিনটি ভিন্ন আকারে তৈরি হতো—লঘু, মধ্যম ও বৃহৎ।
  • দণ্ডের উভয় পাশে দুই, তিন বা চারটি লাউ যুক্ত থাকত, যা সুরের অনুরণন বৃদ্ধি করত।

এই যন্ত্রগুলো পরবর্তীকালের বহু তারযন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

 

নাট্যশাস্ত্রের সাংস্কৃতিক ও তাত্ত্বিক গুরুত্ব

নাট্যশাস্ত্র শুধু একটি সংগীত বা নাট্যগ্রন্থ নয়; এটি ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের ভিত্তি। এখানে রসতত্ত্ব (শৃঙ্গার, বীর, করুণ ইত্যাদি) বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্পের আবেগতাত্ত্বিক দিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা পরবর্তী যুগে সাহিত্য, সংগীত ও নাট্যচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে মঞ্চ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, পোশাক, অভিনয়ের অঙ্গভঙ্গি—সবকিছুর বিশদ নির্দেশনা এতে পাওয়া যায়।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের স্বরব্যবস্থা, তালধারা এবং বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কেও নাট্যশাস্ত্র একটি মৌলিক তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করেছে। এজন্যই সংগীততত্ত্বে এই গ্রন্থকে একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভরতের নাট্যশান্ত

ভরতের নাট্যশাস্ত্র প্রাচীন ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। নাট্য, সংগীত, নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্র—সমস্ত পারফর্মিং আর্টসের যে সুসংগঠিত তত্ত্ব আজও অনুসৃত হচ্ছে, তার মূল ভিত্তি এই গ্রন্থে নিহিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও নাট্যশাস্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি; বরং আধুনিক নাট্য ও সংগীতচর্চায় এর প্রভাব এখনও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাই বলা যায়, ভারতীয় সংগীত ও নাট্যকলার ইতিহাস বোঝার জন্য ভরতের নাট্যশাস্ত্র এক অপরিহার্য শাস্ত্রগ্রন্থ।

Leave a Comment