সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই মানুষ কেবল বেঁচে থাকার মৌলিক তাগিদে অন্ন বা বাসস্থানের সন্ধান করেনি; তার ভেতরের আনন্দ, বেদনা, বিস্ময় ও আত্মিক তৃষ্ণাকে প্রকাশ করার জন্য সে সুর বেঁধেছে, রঙ ছড়িয়েছে, শব্দ বুনেছে আর শরীরের ভঙ্গিমায় আবেগকে রূপ দিয়েছে। গুহাচিত্রের প্রথম আঁচড় থেকে শুরু করে সুপ্রাচীন লোকগাথা, ধ্রুপদী সঙ্গীত, কালজয়ী সাহিত্য কিংবা আধুনিক চিত্রশিল্প, অভিনয় ও চলচ্চিত্র—সবই আসলে মানুষের আত্মপ্রকাশের ও অনুভূতি প্রকাশের সুদীর্ঘ মানবিক আকুলতা। শিল্প ও সংস্কৃতি কোনো বাহ্যিক অলঙ্কার নয়; এটি মানুষের চেতনার দর্পণ, একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত জীবনের নিখাদ স্পন্দন।
আমার কাছে শিল্প ও সংস্কৃতি কেবল বিনোদন বা অবসরের অনুষঙ্গ নয়। এটি হলো ইতিহাসকে গভীরভাবে অনুধাবন করার এবং কালপরিক্রমায় অর্জিত মানবিক প্রজ্ঞার (Wisdom) পরম বাহন। তবে সংস্কৃতি তো কোনো একক বা সংকুচিত আঙিনা নয়—এর পরিধি অসীম ও বহুমাত্রিক। একজন সেতারপ্রেমী যে নিবিষ্টতায় রাগ ও সুরের সাধনা করতে চান, সাহিত্যের সুবিশাল ক্যানভাস, আবৃত্তির বাচিক শিল্প কিংবা নাটকের মঞ্চভাষার চাহিদা তার থেকে আলাদা। এই অনন্যতাকে সম্মান জানাতেই আমরা শিল্প ও সংস্কৃতি গুরুকুল (artsandculture.gurukul.edu.bd)-এর ছায়াতলে সঙ্গীত, লোকজ ঐতিহ্য, ধ্রুপদী শিল্প, সাহিত্য, কবিতা, বাচিক শিল্প, তবলা, বাঁশি, সেতার, বেহালা, অভিনয়, চলচ্চিত্র, নৃত্য, বিতর্ক, ফাইন আর্ট, ড্রয়িং এবং আমাদের প্রাণপুরুষদের স্মরণে ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ ও ‘আমার নজরুল’-সহ ২২টি পৃথক ও নিবেদিত ভের্টিক্যাল গড়ে তুলেছি। এমনকি সুস্থ দেহতত্ত্ব ও নিখাদ ক্রীড়াশৈলীকে শিল্পেরই এক রূপ বিবেচনা করে এর সাথে ক্রীড়া ও ক্রিকেটকেও যুক্ত করা হয়েছে—যাতে প্রতিটি বিষয়ের অনুরাগী তার নির্দিষ্ট পছন্দের গভীরে প্রবেশ করে ইতিহাস, তত্ত্ব, টিউটোরিয়াল, আর্কাইভ ও আধুনিক গবেষণার উপাত্ত খুঁজে পান।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো শিল্পী, সুরকার, সাহিত্যিক কিংবা প্রথাগত সাংস্কৃতিক পণ্ডিত নই। শিল্প-সংস্কৃতির কোনো নির্দিষ্ট শাখায় আমার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পারদর্শিতাও নেই। তবে সংস্কৃতির একজন অনুরাগী ও সামাজিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিষয় গভীরভাবে অনুভব করেছি—আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে শিল্পবোধ, মেধা ও সৃজনশীলতার কোনো অভাব নেই। যা নেই, তা হলো একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস, সমৃদ্ধ আর্কাইভ এবং ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানোর এক সহজগম্য উন্মুক্ত কেন্দ্র।
ঠিক এই উপলব্ধি থেকেই ‘শিল্প ও সংস্কৃতি গুরুকুল’-এর যাত্রা। আমাদের লক্ষ্য কেবল কিছু কনটেন্ট বা তথ্য পরিবেশন করা নয়; বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে আমাদের তরুণেরা সুপ্রাচীন ইতিহাস, তত্ত্ব, পরিবেশনার অন্তর্দৃষ্টি ও নান্দনিক বোধ অর্জনের পাশাপাশি বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের গভীরে শিকড় গেড়ে রেখে আধুনিক যুগের ডিজিটাল মাধ্যম ও সৃজনশীল প্রযুক্তির ভাষাকে তারা যেন অনুধাবন করতে পারে—তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
এর একটি বড় বাস্তবিক ও পেশাগত দিকও রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি ও কালচারাল ইকোনমি আজ বিরাট এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। আমাদের তরুণেরা যদি নিজ নিজ শিল্পধারার তত্ত্ব, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক মানের কৌশল আয়ত্ত করতে পারে, তবে তা শুধু তাদের আত্মিক বিকাশ ঘটাবে না, বরং বিশ্বমঞ্চে পেশাদার শিল্পী, গবেষক ও রূপকার হিসেবে দেশের জন্য সম্মান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। বাংলাদেশের তরুণেরা বিশ্বের নানাপ্রান্তের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখুক—এটি আমার এক সুগভীর স্বপ্ন।
রাতারাতি একটি পুরো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আবহাওয়া বদলে দেওয়া কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, তা আমি জানি। তবে প্রতিটি ঐতিহাসিক যাত্রার পেছনে থাকে একটি ছোট শুরু। ‘শিল্প ও সংস্কৃতি গুরুকুল’ সেই দীর্ঘ পথেরই এক বিনীত পদক্ষেপ—যেখানে শিল্পকে দেখা হবে আত্মাকে জানার, ইতিহাস ও প্রজ্ঞাকে লালন করার, নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এবং এক আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের দরদী ভাষা হিসেবে।
তবে আগের মতোই একটি সত্য অকপটে স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই সুবিশাল উদ্যোগের সূচনাটুকু করলাম, কিন্তু একে কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক, শৈল্পিক ও বস্তুনিষ্ঠ উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ক্ষেত্র ও আগ্রহের পরিধি অত্যন্ত বিচিত্র ও ছড়ানো-ছিটানো—যা আমার একটি বড় ব্যক্তিগত দুর্বলতা। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে একক মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমার ওপর নির্ভর করে ২২টি ভিন্ন ভিন্ন বিশেষায়িত শিল্পধারার এই সুবিশাল আয়োজন খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।
তাই দেশ-বিদেশের বরেণ্য শিল্পী, প্রখ্যাত সুরকার, সাহিত্যিক, নাট্যজন, প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, গবেষক এবং সংস্কৃতি অনুরাগী গুণীজনদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আকুল নিবেদন—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন, এর বিভিন্ন ভের্টিক্যালগুলোর দিকনির্দেশনার দায়িত্ব নিন এবং ‘শিল্প ও সংস্কৃতি গুরুকুল’-কে আপনাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের অভিজ্ঞ হাতের স্পর্শ, প্রজ্ঞা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলেই এই প্রচেষ্টা পূর্ণতা লাভ করবে এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা, শিল্প ও সংস্কৃতি গুরুকুল